নিঃস্বার্থ প্রেম – পর্ব ৩
অরণির মৃত্যুর পর শুভর জীবন পুরোপুরি বদলে গেল। বাইরের দুনিয়ায় সে আগের মতোই রইল—একজন দায়িত্ববান স্বামী, একজন যত্নশীল বাবা, একজন সফল কর্মী। কিন্তু ভেতরে? ভেতরে কোথাও একটা শূন্যতা পাকাপাকিভাবে জায়গা করে নিলো।
কখনো কখনো গভীর রাতে শুভ জেগে উঠত, মনে হতো দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। ঘুমের ঘোরে মনে পড়ত অরণির হাসি, তার চঞ্চল চোখদুটি। মনে হতো, যদি একবার ফিরে যেতে পারত সেই পুরনো দিনে, তাহলে হয়তো গল্পটা অন্যরকম হতে পারত।
অরণির স্মৃতিতে…
অরণির মৃত্যুর পর শুভ খুঁজতে শুরু করল তার রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো। স্কুলে গিয়ে তার ডেস্কে বসে রইল অনেকক্ষণ, দেয়ালে ঝোলানো তার ছবি ছুঁয়ে দেখল। সহকর্মীরা বলল,
—"অরণি ম্যাডাম বলতেন, জীবনটা অনেক সুন্দর, যদি নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারো।"
শুভ শুনল, কিন্তু কিছু বলল না। শুধু মনে মনে ভাবল—কেউ যদি ভালোবাসতে চায়, তবে তার কি এভাবে একা চলে যাওয়া উচিত?
একদিন সে অরণির পুরনো ফ্ল্যাটে গেল। এখন সেখানে অন্য কেউ থাকে, কিন্তু নতুন বাসিন্দারা জানালো, অরণির কিছু পুরনো জিনিস এখনও তাদের কাছে আছে।
একটা ছোট বাক্স এনে দেওয়া হলো শুভকে। সে ধীরে ধীরে বাক্সের ঢাকনা খুলল।
ভেতরে কিছু পুরনো চিঠি, কিছু ছবি, আর একটা ডায়েরি। শুভ কাঁপা হাতে ডায়েরিটা খুলল। প্রথম পাতায় লেখা ছিল:
"যদি কখনো তুই এই ডায়েরিটা পড়িস, তাহলে জেনে রাখিস, আমি তোকে কোনোদিন দোষ দেইনি। আমি শুধু চাইতাম, তুই সুখী থাকিস।"
শুভর চোখে জল চলে এলো। সে পাতা উল্টে উল্টে দেখল—সবাই যখন জানত, অরণি নিঃসঙ্গ ছিল, তখন সে এই ডায়েরিতে তার ভালোবাসার কথা লিখে গেছে। কোনোদিন প্রকাশ না করা সব অনুভূতি এখানে লিপিবদ্ধ।
একটা পাতায় লেখা ছিল:
"শুভর বিয়ে হয়ে গেছে। আজ তার ছবি দেখলাম। সে খুব খুশি। আমার বুকটা একটু মোচড় দিলো, কিন্তু এটাই তো আমি চাইতাম, তাই না?"
আরেকটা পাতায় লেখা:
"কিছু ভালোবাসা হয়তো কখনোই বলার জন্য নয়, শুধু অনুভব করার জন্য।"
শুভ বুঝতে পারল, এত বছর ধরে সে একটা মানুষকে বুঝতেই পারেনি। আর যখন বুঝল, তখন সময় শেষ হয়ে গেছে।
একটা শেষ উপহার
শুভ সিদ্ধান্ত নিল, কিছু একটা করতে হবে অরণির স্মৃতির জন্য।
কয়েক মাস পর, শহরের এক কোণে একটা ছোট্ট স্কুল খুলল শুভ। স্কুলের নাম দিল "অরণি বিদ্যানিকেতন"। এখানে শুধু দরিদ্র শিশুদের পড়ানো হবে, যারা ভালো শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায় না।
উদ্বোধনের দিন শুভর স্ত্রী মেহুল পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
—"তুমি কি জানো, আমি কখনো তোমাকে দোষ দিইনি?"
শুভ চমকে তাকাল।
—"কিসের জন্য?"
—"অরণির জন্য। আমি জানতাম, সে তোমার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি শুধু চেয়েছি, তুমি একদিন সেটা উপলব্ধি করো।"
শুভ কিছু বলল না, শুধু চোখের কোণে জমে থাকা জলটা মুছল।
অরণি আর নেই, কিন্তু তার ভালোবাসা বেঁচে রইল—সেই সব ছোট ছোট শিশুর মধ্যে, যারা এই স্কুলে এসে নতুন স্বপ্ন দেখবে।
কারণ কিছু ভালোবাসা কখনো ফুরায় না। কিছু ভালোবাসা মানুষকে বদলে দেয়, তাকে আরও ভালো কিছু করার অনুপ্রেরণা দেয়।
শুভ জানে, সে অরণিকে ফিরে পাবে না। কিন্তু সে জানে, প্রতিদিন এই স্কুলের প্রতিটি শিশুর হাসির মাঝে, প্রতিটি শেখার মুহূর্তে, কোথাও না কোথাও অরণি বেঁচে থাকবে—চিরদিন, চিরকাল।
চলবে..........